চৌগাছায় শিশু শর্মিলার লাশ বস্তা বন্দি করে রাখা হয় ঘরের বাক্সে!

চৌগাছায় শিশু শর্মিলার লাশ বস্তা বন্দি করে রাখা হয় ঘরের বাক্সে!

নিজস্ব প্রতিবেদক:

যশোরের চৌগাছায় স্কুল ছাত্রী হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যকার তথ্য পাওয়া গেছে। হত্যার পর লাশ বাড়িতে এনে পেট কেটে নাড়ি ভুড়ি বের করে ফেলা হয়।

লাশের মাথার চুলসহ অনেক কিছুই কেটে তা মাটিতে পুতে ফেলা হয়। এরপর লাশ বস্তা বন্দি করে ঘরের বারন্দায় থাকা বড় টিনের সাব-বাক্সে লুকিয়ে রাখা হয়।

হত্যার চার দিন পর লাশ ওই বাক্স থেকে বের করে শিশুটির বাড়ির অদুরে আমবাগানে ফেলে রেখে আসে হত্যাকরীরা। নিহত শিশুর বড় বোন হত্যাকারীর প্রেম প্রস্তাব প্রত্যাখান করায় ছোট বোনকে জীবন দিতে হয়েছে বলে জানান স্বজনরা।

আরো পড়ুনঃ চৌগাছায় মাদ্রাসা ছাত্রী শর্মিলা হত্যার আসামীদের আটক করল গ্রামবাসী

এ ঘটনায় জড়িত অভিযোগে ৬ জন গ্রেফতার হলেও ১ জনকে আসামী করে হত্যা মামলা করা হয়েছে। তবে মামলার বাদি নিহত শিশুর পিতার দাবি তিনি গ্রেফতারকৃত ছয়জনকেই আসামী করে মামলা করেছেন।

সূত্র জানায়, স্কুল ছাত্রী শর্মিলা খাতুন (১০) নিখোঁজ হওয়ার চার দিন পর তার গলিত লাশ বাড়ির অদুরে একটি আমবাগান থেকে উদ্ধার করে থানা পুলিশ।

এ ঘটনার একদিন পর বুধবার বিকেলে মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলার বিলধরা গ্রামের তবির উদ্দিনের ছেলে এ ঘটনার প্রধন অভিযুক্ত তজিবর রহমানকে আটক করে গ্রামবাসি।

তার শিকারোক্তিতে চৌগাছার ফকিরাবাদ গ্রামের আবু বক্করের ছেলে জাহাঙ্গীর (৪৮), তার পুত্র রাজু (১৪), জাহাঙ্গীরের জামাই ও জলিল ওরফে ভাষনের ছেলে সুমন (৩২), জাহাঙ্গীরের বোন- জামাই ও রফিকুলের ছেলে তুষার (৩২) এবং তুষারের ছেলে নাহিদকে (১৩) গ্রামবাসি ধরে পুলিশে সোপর্দ করে।

আরো পড়ুনঃ চৌগাছায় নিখোঁজ মাদ্রাসা ছাত্রীর লাশ উদ্ধার

ওই রাতেই নিহত শিশুর পিতা বাদি হয়ে থানায় মামলা করেন। মামলা নং ২৪, তারিখ-২৭-০৬-২০১৮। মামলায় মেহেরপুরের তজিবর রহমানকে আসামী করা হয়। গ্রেফতার বাকি পাঁচজনকে আসামী করা হয়নি।

বৃহস্পতিবার আসামী তজিবর রহমানকে জেল-হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। তবে নিহত শিশুর পিতা হাফিজুর রহমান ওরফে কালু বলেন, পুলিশ রাতে আমাকে বাড়ি থেকে ডেকে থানায় নিয়ে একটি কাগজে স্বাক্ষর করে নেয়, বলে মামলা করা হচ্ছে। মামলায় একজনকে আসামী করা হয়েছে তা আমাকে জানানো হয়নি। আমি ভভিযুক্ত সকলকেই আসামী করেছি বলে জানি।

এদিকে নির্মম এই হত্যাকান্ডের ৭ দিন পর চাঞ্চল্যকার সব তথ্য বের হতে শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার সরেজমিন এলাকায় গেলে এ সকল তথ্য পাওয়া যায়।

নিহতের পরিবারসহ এলাকার একাধিক ব্যক্তি জানান, নিহত শিশু শর্মিলার বড় বোন হাকিমপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণির ছাত্রী উর্মিলা খাতুনকে (১৩) জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে ফটকা মুন্সির বখাটে ছেলে রাজু প্রেম প্রস্তাব দেয়। এ ঘটনা জানাজানি হলে উভয় পরিবারের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাধে।

একপর্যায় রাজু তাদের দেখে নেয়ার হুমকি দেয়। এই ঘটনার প্রায় ১ মাস পর গত ২২ জুন সন্ধ্যায় উর্মিলার ছোট বোন শর্মিলাকে আম দেয়ার নাম করে রাজু ও তুষারের ছেলে নাহিদ আম বাগানে ডাকে। শর্মিলার পরিবারের দাবি রাজু ও নাহিদ তাকে ধর্ষন করে। সে চিৎকার দেয়ার চেষ্টা করলে তার শ্বাসরোধ করা হয়।

একপর্যায় শর্মিলার মৃত্যু হলে ঘটনাটি রাজু তার পিতা জাহাঙ্গীরকে বলে। এ সময় জাহাঙ্গীর তার ছেলে রাজু ও রাজুর বন্ধু নাহিদকে বকাঝকা করে। লাশ কি করবে কোথায় রাখবে, মৃত্যু ঘটনাটি কিভাবে চাপা দেয়া যাবে এ নিয়ে তারা বেশ চিন্তায় পড়ে যায়। সূত্র জানায়, ঘটনার প্রায় ৩ ঘন্টা পর রাত ৯ টার দিকে জাহাঙ্গীর আম বাগান থেকে লাশ নিয়ে তার বাড়িতে নিয়ে আসে।

বাড়িতে শর্মিলার লাশ নিয়ে এসে ঘরের বারান্দায় রাখা হয়। এরপর লাশের পেট চিরে নাড়ি ভুড়িসহ মাথা ও হাত পায়ের মাংস কেটে ফেলে জাহাঙ্গীর। পরবর্তীতে লাশ পলিথিন বন্দি করে ঘরের বারান্দায় রাখা বড় সাব-বাক্সে রাখে। তাদের ধারনা লাশের মাংস ও নাড়ি ভুড়ি বের করলে গন্ধ ছড়াবেনা।

কিছু দিন পর শুকিয়ে যাওয়া কংকাল কোথাও ফেলে রেখে আসবে। কিন্তু ঘটনার ৪ দিন পর পচা দূর্গন্ধ বের হতে শুরু করলে সন্ধ্যার পরে লাশ বাক্স থেকে বের করে পাশেই আম বাগানে ফেলে তা লতা-পাতা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। যে ঘরের বারান্দায় শিশুটিকে কাটা ছেড়া করা হয় ওই ঘরের বান্দায় এখন রক্তের ছাপ ছাপ দাগ লেগে আছে। বাড়িটি থেকে পচা দূর্গন্ধ ও ব্যাপক কেরসিন তেলের গন্ধ বের হচ্ছে।

সকলে ধারনা করছে জাহাঙ্গীর একাই শিশুটিকে এ ভাবে কাটা ছেড়া করে বাক্স বন্দি করেছে। স্থানীয়রা বলছেন জাহাঙ্গীর গ্রামের বসবাস করছেন ২ বছর ধরে। তার বাড়ি ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুরের ফতেপুরের সাড়াতলা গ্রামে। জাহাঙ্গীরকে বুধবার আটক করা হলেও মামলায় আসামী করা হয়নি।

অন্যদিকে স্ত্রী এখনও পালাতক। এলাকাবাসি জানান, ফতেপুর গ্রামের দু’টি হত্যা মামলার আসামী এই জাহাঙ্গীর।

দীর্ঘদিন সে ঢাকাতে আত্মগোপনে থেকে কসাই এর কাজ করত। প্রায় দুই বছর আগে সে চৌগাছার হাকিমপুর ইউনিয়নের আজিজুর রহমানের সাথে পরিচয় হয়। তার বাড়িতে কাজ করার কথা বলে সে ওই ইউনিয়নে আসে।

আজিজুর রহমানের ফকিরাবাদ গ্রামের আম বাগানে কিছু জমি নিয়ে সে একটি টিন সেটের বাড়ি বানিয়ে সেখানে বসবাস শুরু করে এবং আজিজুরের পরিবারের কাজ করে। প্রতিবেশি ফজলুর রহমান, সাজিদা বেগম, আলিমুন নেছা, আব্দুল কুদ্দুস, কলেজ ছাত্র আল আমিন, মিরাজুল ইসলাম জানান, শর্মিলা নিখোঁজ হলে আমরা যখন সকলে তাকে খুজতে থাকি তখন আটক সকলেই আমাদের সাথে খুজতে থাকে।

এমনকি জাহাঙ্গীর হোসেনের বাড়ির পিছনে একটি পুকুর আছে আমরা সকলেই রাতে ওই পুকুরে শর্মিলাকে খুজতে যাই। ধারণা করছিলাম হয়ত পুকুরের পানিতে ডুবে যেতে পারে। পুকুরেও হত্যাকরীরা আমাদের সাথে খুজতে নামে। শর্মিলার লাশ পাওয়ার পর আত্মীয় স্বজন আসতে থাকে।

গ্রামের লোকজনের আত্মীয়- স্বজনদের খাবার রান্নার কাজেও হত্যাকারীরা সহযোগিতা করেছে। এ সবই তাদের লোক দেখানো ছিল বলে এখন বুঝতি পারছি। নিহত শিশুর মা জাহানারা বেগম ওরফে জানু, চাচি শিউলী বেগম, চাচা আজিজুর রহমান, শরিফুল ইসলাম বলেন, প্রতিশোধ নিতেই তারা পরিকল্পিত ভাবে আমার সন্তানকে হত্যা করেছে। এই হত্যাকান্ডের আমি আমরা সুষ্ঠু বিচার চাই।

লোহমর্ষক এই ঘটনায় ৬ জনকে গ্রামবাসি আটক করে থানা পুলিশে দিলেও মাত্র একজনের নামে মামলা হওয়ায় চরম ক্ষুব্ধ এলাকাবাসি। মামলার বাদি বলেন, আমি অশিক্ষিত মানুষ পুলিশ একটি কাগজে স্বাক্ষর করে নিয়েছে সেখানে কি লেখা আছে আমি কিছুই জানিনা। আমি শুধু এই টুকু জানি আটক সকলকে আসামী করা হয়েছে।

এ বিষয়ে চৌগাছা থানা অফিসার ইনচার্জ খন্দকার শামীম উদ্দিন বলেন, ঘটনার সাথে তজিবর রহমান নিজে জড়িত তার শিকারোক্তিতে তাকে আসামী করে মামলা করা হয়েছে এবং বৃহস্পতিবার জেল হাজতে প্রেরন করা হয়েছে।

About Benapole Pratidin

Check Also

শাহীন চাকলাদারের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পাওয়ার পরও যশোরের দুটি আসন থেকে মনোনয়নপত্র দাখিলের একদিন পর প্রত্যাহার …